নিয়মিত অনুচর – মেহেরুন নেছা রুমা

রিপন যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে বাড়ির পেছনের দুটি ঘরের অনেকটাই স্পষ্ট দৃশ্যমান । বারান্দাসহ ঘরটিতেই থাকে মিতু। রিপনের চোখ সেই বারান্দার দিকে, কখনও বারান্দা ভেদ করে সেই ঘরের মধ্যখানটিতে; যেখানে আজ অসংখ্য মানুষের আনাগোনা। অন্য সময়ে সেই ঘর এবং ঘরের বারান্দায় শুধু মিতুকেই দেখত সে। আজকের ব্যাপার ভিন্ন।

শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি । ভেজা মাটির গন্ধ, গোবরের গন্ধ, আঁশটে জাল-ঝারা মাছের গন্ধ, স্তূপ করা পচা পাতার গন্ধ, বিয়ে বাড়ির নানারকম মুখরোচক খাবারের গন্ধ, ঘাসের গন্ধ, বৃষ্টির নিজস্ব গন্ধ। অজস্র গন্ধের সম্মিলনে মনস্কে কেমন নেশাধরা ভাব। এই নেশার ভাবের সাথে খানিকটা ঘুমের ভাব যোগ হয়ে রিপনের দু’চোখ তখন ঢুলঢুলু।  কানের কাছে বাজছে মশাদের বেসুরো বেহালার সুর। প্যাচপ্যাচ কাদামাটিতে পায়ের পাতা ডুবিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা ততটা যন্ত্রণাকর নয়; যতটা যন্ত্রণাকর এই ছোট্ট আট-পায়া আজব প্রাণী মশাদের প্যানপেনানি আর কুট্টুসকাট্টুস কামড়।

রিপন দাঁড়িয়ে আছে ঘণ্টা দেড়েক হল। একটু আগে গায়ের জামাটি নিংড়ে নিয়ে পানিটা ফেলে একটা গাছের ডালের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিল। সেই সুযোগে মশারা খালি গায়ে ভোজসভার আয়োজন করতে বসল। পায়ের কাছে কুট্টুস কামড় টের পায় রিপন। হাত দিয়ে ঘষা দিলে একটি দুটি মশা পিষে ভর্তা হয়ে যায়। আবারও কামড় অনুভব করতেই ঘষা দিল সে। কিন্তু এবার আর পূর্বেকার মতো আট-পায়া প্রাণীর পিষে যাওয়া দেহাবশেষ হাতে লাগল না । একটু স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা কিছুর অস্তিত্ব টের পেল। হাঁটুর উপর ভর দিয়ে উবুর হয়ে মোবাইলের আলো দিয়ে দেখা গেল একটি কালো কুচকুচে তেলতেলে কিছু চামড়ার সাথে লেগে আছে। প্রাণীটিকে জোক বলে চিনতে পারে সে। প্রায় দেড়/দু ইঞ্চি লম্বা জোকটি কামড় দিয়ে তখনও নিশ্চিন্তে রক্ত চুষে যাচ্ছে । দুই আঙুল দিয়ে জোকটাকে ধরে টান মারতেই সেটি আরো লম্বা হয়ে গেল রাবারের মত। তবু কামড় ছাড়ল না। এবার পা ছেড়ে জোকটি রিপন যে আঙুল দিয়ে ধরেছে সেই আঙুল থেকে তরতর করে হাত বেয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগল। বেশ কয়েকবার হাত ঝাড়া দিয়ে, গাছের সাথে ঘষে; অত:পর অন্য হাতের সাহায্যে জোকের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া গেল। কত ছোট্ট অথচ কী সাংঘাতিক জন্তু! এখনও রিপনের সারা গায়ে মনে হচ্ছে জোক হেঁটে বেড়াচ্ছে।

ঘুটঘুটে অন্ধকার। খানিক আগে ঝপাঝপ করে আরও এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। এতক্ষণ পর্যন্ত শরীরের তাপ আর বাইরের তাপ সম পর্যায়ে ছিল, এখন শরীরের তাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে বলে বাইরের তাপ কম বলে মনে হচ্ছে। শীত শীত লাগছে। বেশ কয়েকবার শব্দটা চেপে রেখে হাঁচি দিল সে। শব্দ মানেই বিপদ!

অসংখ্য গন্ধের সংমিশ্রণের মাঝে রিপনের অনুভ’তিতে সেই পরিচিত গন্ধও এসে লাগে। মিতুর গায়ে মাখা সেই বিশেষ পারফিউমের গন্ধ, মেহেদির গন্ধ, শ্যাম্পু করা ভেজা চুলের গন্ধ। কিন্তু একটি আফসোস, আজ পর্যন্ত মিতুর শরীর থেকে যৌনতার গন্ধ সে পায়নি। মিতু বরাবরই শক্ত, বিয়ের আগে ওসব চলবে না।

উঠান পেরিয়ে পুকুরের অপর পাড়ে গায়ে-হলুদের মঞ্চ। রাত বারোটায় মিতুকে মঞ্চে নেয়া হবে। তার আগে সে একবার বের হয়ে আসবে এই পেছনের দরজা দিয়ে। সেই প্রতীক্ষা বড় দীর্ঘ প্রতীক্ষা! প্রতীক্ষার সাথে আছে ভবিষ্যৎ রঙিন স্বপ্নের এক অভূতপূর্ব সোপান । আর সেই সোপানের প্রথম ধাপে দুজনে একই সাথে পা রেখেছিল।

কীটপতঙ্গের ঠোকাটুকি, বৃষ্টির উৎপাত আর অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে গায়ে জ্বর এসে যায় রিপনের। ঘড়ির কাটা এগারোটা ছুঁই ছুঁই। মিতু বলছিল সন্ধ্যার পরপরই চেষ্টা করবে বের হওয়ার। কিন্তু সেই মগরিবের আজানের সময় থেকে সাজতে বসেছে সে।

সাজরত অবস্থায় কথা বললে চামড়ায় ভাজ পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই মোবাইল ফোনটি বন্ধ।
কানাডা প্রবাসী পাত্রের সাথে বিয়ে পাকাপাকি হবার পর কে বা কারা পাত্রপক্ষের কানে একটি কথা চালান করে দিয়ে বিয়ে প্রায় ভেঙে দেয়ার উপক্রম করেছিল। মিতুর গায়ের রং নাকি কালচে আর নাক বোঁচা । বোঁচা নাক তীক্ষè করার, ময়লা রং সাদা করার সমস্ত কৌশলই আছে বিউটিশিয়ানদের কাছে। তারাই এখন মিতুকে নিয়ে ব্যস্ত।

আমাদের সমাজে তাই রীতি হয়ে দাঁড়ায়, পুরুষতন্ত্র যা তৈরি করে দেয়। তাই তো কালো মেয়ে কোন বাড়ির বউ হতে নেই, মেয়েরা সাজে নিজেদের জন্য নয়; পুরুষের চোখে সুন্দর দেখানোর জন্য। তাইতো পবনকে বিয়ে করতে যাচ্ছে রিপনের পরামর্শে। সেই রিপন, যাকে নিয়ে সে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছিল এতদিন। স্বপ্ন শুধু মিতু একারই ছিল না। সেই স্বপ্নে রিপনেরও সমান অংশীদারিত্ব ছিল। রিপনও বুনেছিল এক একটি সপ্নের বীজ। দুজনে মিলে সেই বীজের দিকে তাকিয়ে প্রহর গুনেছিল। স্বপ্নের চারাটি জন্মালে তাতে পানি দিয়ে আলো দিয়ে বাড়িয়ে তুলেছিল দুজনে মিলেই। তাতে কেমন করে যে আগাছা জন্মালো  মিতু তা টের পেল না।

রাত সারে এগারোটা বাজে, রিপনের জ্বর আরো বেড়ে গিয়ে থরথর কাঁপতে লাগলো। মশার কামড় খেয়েই যায়। এখন আর মারতে ইচ্ছা করে না। আর মাত্র ত্রিশ মিনিট সময় আছে। এর মধ্যে না পারলে মিতু আর বাইরে আসতে পারবে না। বারোটায় অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। দিনের বেলায় দেখা করার কোন সুযোগ নেই। কাল সন্ধ্যায় বিয়ে। দুপুরের পরই মিতুরা সবাই চলে যাবে ওর মামা বাড়ি। বিয়ের অনুষ্ঠানটা সেখানেই হবে।

বিয়ের তিনদিন পরেই মিতুকে নিয়ে পবন কানাডা চলে যাবে।  রিপনের সাথে আজ রাতে দেখা না হলে দেখা হওয়ার আর সুযোগ থাকবে না। মাথা ঘুরতে থাকে রিপনের।

উন্নত দেশে পাড়ি দেয়া এবং রাতারাতি বিত্ত বৈভবের অধিকারী হওয়ার স্বপ্নটা রিপনের বহুদিনের। কিন্তু উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না কিছুতেই। এরই মধ্যে এক কানাডা প্রবাসী পাত্রের পক্ষ থেকে মিতুর জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসতেই রিপন যেন তার আকাঙ্খিত স্বপ্নের সিঁড়িটির খোঁজ পেয়ে বসে। মিতু কিছুতেই ওই বিয়েতে রাজি না থাকলেও রিপনই তাকে রাজি করায়। বলে, পাগলী মেয়ে এই তো আমাদের সুযোগ। ওই লোকটিকে বিয়ে করে তুমি কানাডা চলে যাবে। তুমি যখন সিটিজেনশিপ পাবে তখন আমাকে নেয়ার ব্যবস্থা করবে। তারপর কোনরকম আমি যেতে পারলেই আমাদের সব চিন্তা দূর। ওখানে গিয়ে সেটল হলেই তুমি আমার কাছে চলে আসবে। এরপর আমাদের সুখের সংসার। ভেবে দেখ কত সুন্দর ভবিষ্যৎ আমাদের।

সারারাত জঙ্গলে দাঁড়িয়ে থেকেও মিতুর দেখা না পেয়ে রিপন ফিরে আসে তার ঘরে। প্রচন্ড জ্বর নিয়ে সপ্তাহ্ খানেক পড়ে থাকে বিছানায়। মেচের জীবন-যাপনে অসুখ-বিসুখ হলে দুর্ভোগের শেষ নেই। সারাদির ঘরের অন্য ছেলেগুলি ঘরে থাকে না। রাতের বেলা ফিরে এসে তাদের কেউ কেউ রিপনের সেবা যতœ করে। এই সাত দিনে রিপন মিতুর কোন খবর নিতে পারেনি।

যাকে ভালোবাসে তাকে তুলে দিচ্ছে অন্য একজনের সাথে! এ কেমন মানুষ! মিতু কিছুতেই ব্যাপারটাকে মানতে পারছিল না। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সেদিন; যেদিন রিপন তার ভবিষ্যৎ গড়ার ওই স্বপ্নপূরণের ছক এঁকেছিল। মনে মনে সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে পরকে ঠকিয়ে আপনি বড় হতে চায়, এমনকি সেই বড় হতে গিয়ে নিজের ভালোবাসার মানুষকে পর্যন্ত পরের হাতে তুলে দেয়। সে কোনদিন ভালোবাসতেই জানে না।

অনেকদিন পর রিপন ফেসবুকে দেখতে পায় মিতু আর তার স্বামীর যুগল ছবি। আইডিটি মিতুর নামে, সমস্ত ওয়াল জুড়েই এক পরিপূর্ণ সুখি দম্পতির উপস্থিতি। রিপন এখন সেই ওয়ালের একজন নিয়মিত অনুচর।