প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে বিশেষায়িত ভার্সিটির অগ্রণী ভূমিকা জরুরি

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বিরূপ প্রতিক্রিয়ার নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে আমাদের কৃষিতে পড়তে শুরু করেছে। অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের অব্যাহত অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় গবেষক ও বিজ্ঞানীদের নতুন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে মনোযোগী হতে হবে। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। সাথে সাথে গবেষণা ও উদ্ভাবনে ফল যাতে ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে তাও নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিভাসু) ১ম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। নগরীর খুলশী ক্যাম্পাসের খেলার মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. আবদুল হামিদ সভাপতিত্ব করেন।
অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. এ কে আজাদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান। স্বাগত বক্তব্য দেন সিভাসুর উপাচার্য প্রফেসর ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্য দেশে উন্নয়নের ধারাবাহিতকতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা আমাদের স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিক্রম করেছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর পরই জাতির উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া স্বাধীনতা অর্থহীন। অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে প্রাণ দিয়েছেন। দীর্ঘ অগণতান্ত্রিক শাসনের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশ উন্নয়নের এক রোল মডেল হিসিবে নন্দিত। আমরা ইতিমধ্যেই নি¤œ-মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি এবং ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য-আয়ের দেশে পরিণত হবো।’
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ যুবসমাজকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রায় ৬ কোটি কর্মক্ষম নারী-পুরুষ আমাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট আহরণের এক অপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল সময় অতিক্রম করছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তরুণদের সুশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।’
রাষ্ট্রপতি শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জাতি গঠনের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। যেখানে মেধা বিকাশের সব পথ উন্মুক্ত থাকে। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয় বরং দেশ-বিদেশের সর্বশেষ তথ্যসমৃদ্ধ শিক্ষা, গবেষণা এবং সৃজনশীল কর্মকা-ে যাতে শিক্ষার্থীরা অবদান রাখতে পারে সেলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে বন্ধুত্বপূর্ণ ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কার্যকর ভূমিকা রাখে। তাই শিক্ষকদের হতে হবে ¯েœহপ্রবণ ও অভিভাবকতুল্য।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, তোমাদের এ অর্জনে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের অবদান রয়েছে। তোমরা সেবা, সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম দিয়ে এ সনদের মান সমুজ্জ্বল রাখবে। অন্যায় ও অসত্যের কাছে কখনো মাথা নত করবে না। বিবেককে বিকিয়ে দেবে না।’
স্বাগত বক্তব্যে সিভাসুর উপাচার্য প্রফেসর ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি সেন্টার অব এক্সেলেন্স হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক জয়েন্ট কোলাবরেশন, গবেষণা এবং ছাত্র-শিক্ষক বিনিময় কার্যক্রম আমাদের সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তন ও গবেষণাকর্মে আমরা ব্যাপক সাফল্য পেয়েছি। মুরগির উন্নত জাত উদ্ভাবন, ক্যাটল বিস্কুট, মুরগি ও গরু ছাগলের মরণব্যাধি প্রতিরোধ, নরম খোলসের কাঁকড়া চাষের পদ্ধতি উদ্ভাবনে সাফল্য পেয়েছি। ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া আমাদের উদ্ভাবিত নরম খোলসের কাঁকড়া চাষের প্রযুক্তি গ্রহণ করতে গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
উপাচার্য জানান, মাঠ পর্যায়ে গবেষণার জন্য কক্সবাজার, হাটহাজারী ও ঢাকার পূর্বাচলে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। হাটহাজারীতে রিসার্চ ও ফার্ম বেজড ক্যাম্পাস স্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৮০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। আগামী এপ্রিল-মে মাসে কাপ্তাই লেকের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে একটি ভ্রাম্যমাণ গবেষণা তরী চালু করা হবে।
অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের জনবান্ধব সরকার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সে লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন কৃষি সম্পর্কিত সব বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিজ্ঞানী, শিক্ষার্থীবৃন্দ তাদের গবেষণা ও কাজের মাধ্যমে দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতায় ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁরা পশুপালন, মৎস্য চাষ, ফুড টেকনোলজির ক্ষেত্রে গবেষণা ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন।
তিনি সিভাসুর ¯œাতকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা জানেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা জাতিসংঘে গৃহীত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের সব দেশকে যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পেশাজীবীদের মধ্যে কৃষি ও ¯œাতকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের সমাবর্তনে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি লাভ করেছেন, আমি আশা করছি তারা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি) অর্জনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে এবং রাখবে।’ তিনি ডিগ্রিধারীদের দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহবান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান বলেন, ৯০ দশকের আগে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সেক্টরের গ্র্যাজুয়েট তৈরি হতো শুধুমাত্র বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে। বর্তমানে আরো ৭টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ ধরনের ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়, যেখান থেকে আন্তর্জাতিক মানের ভেটেরিনারি, মৎস্য ও খাদ্য বিজ্ঞানে ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। তবে জনগণের অর্থে অর্জিত ডিগ্রি যেনো মানুষের উপকারে আসে সেদিকে ¯œাতকদের সজাগ থাকতে হবে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে গবাদিপ্রাণি ও মৎস্যসম্পদ উৎপাদনের যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপাদিত মৌসুমী ফলমূল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কৃষক ও ভোক্তাদের সহযোগিতা দিতে পারে এ বিশ্ববিদ্যালয়।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকা-ের ওপর নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ডিগ্রি প্রদান, স্বর্ণপদক প্রদান ও ক্রেস্ট বিনিময় করা হয়। ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সিভাসুর রেজিস্ট্রার মির্জা ফারুক ইমাম।
গতকাল সিভাসুর প্রথম সমাবর্তনে ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৮৪৪ জনকে ¯œাতক, ২১৬ জনকে ¯œাতোকোত্তর এবং ২জনকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে।

Comments

comments

Leave a Reply