মহানবী (সা.) এর প্রতি আদব

মুফতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ : মহানবী (সা.) এর প্রতি এ আদব প্রদর্শন যেভাবে তাঁর বরকতপূর্ণ জীবদ্দশার ক্ষেত্রে অবশ্য জরুরি ছিল একইভাবে তা তাঁর ইন্তেকাল-পরবর্তী সময়ের ক্ষেত্রেও অবশ্যই জরুরি বলে গণ্য। আজও মসজিদে নববি (সা.) এর রওজা শরিফের দিকের দেয়ালের গায়ে ওই আয়াতটি খোদাই করে লিখিত আকারে বিদ্যমান। জিয়ারতকারীদের জন্য জরুরি, পবিত্র রওজা শরিফে উপস্থিতির সময় সালাত ও সালাম পাঠকালীন নিজ নিজ আওয়াজ নিচু রাখা চাই

 

বিশ্ব চরাচরের অহংকার, শ্রেষ্ঠজনদের শীর্ষ মনীষী, সর্বজগতের প্রভুর সর্বাধিক প্রিয়ভাজন নবী মুহাম্মদ (সা.) এর সম্মান ও মর্যাদা অতুলনীয়। অতি পবিত্র ও মহিমান্বিত তার জীবন। তিনি আল্লাহপাকের এমন প্রিয়পাত্রÑ

– যাঁর শুভ জন্মের দ্বারা পারস্যের উপাস্য অগ্নিকু- নির্বাপিত হয়েছিল।

– যাঁর ফয়েজ ও বরকতপূর্ণ মুখে দোলনায় শৈশবে ‘আল্লাহ আকবার’ বাক্য উচ্চারিত হয়েছে।

– যিনি নবী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার আগেই ‘আল-আমিন’ তথা সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।

– যাঁর ‘রাসুল’ হওয়ার পক্ষে জড়পদার্থও সাক্ষ্য প্রদান করেছে।

– মিরাজের মতো অলৌকিক সুমহান ঘটনা একমাত্র তাঁরই ভাগ্যে জুটেছে।

– যাঁর পবিত্র দরবারের দ্বাররক্ষী সিদ্দিক আকবরের মতো মনীষী হয়েছেন।

– যাঁর ঈমানের ভা-ারের প্রভাবে ফারুকে আজম (রা.) ঈমানপ্রাপ্ত হয়েছেন।

– যাঁর লজ্জাশীলতার জ্যোতির প্রভাবে ওসমান (রা.) জিন্নুরাইন হয়েছেন।

– যাঁর শহরকে বিশ্বজগতের মালিক ‘বালাদে-আমিন’ বলেছেন।

– যাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাবকে ‘কিতাবে মুবিন’ বলেছেন।

– যাঁর প্রতি মহান প্রভু ও তাঁর ফেরেশতারা দরুদ পাঠান।

– যাঁর উম্মতকে মহান রব নিজেই ‘শ্রেষ্ঠ উম্মত’ নামে উল্লেখ করে থাকেন।

এমন মহিমান্বিত নবীজির প্রতি আদব ও সম্মান দেখানোর জন্য আল্লাহপাক নির্দেশ দিয়েছেন কোরআন মজিদে :

‘নিশ্চয় আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আন এবং তাঁর শক্তি জোগাও ও তাঁকে যথাযথ আদব-সম্মান করো।’ (সূরা : আল-ফাতহ : ৮-৯)।

মহানবী (সা.) এর প্রতি আদব রক্ষা সম্পর্কিত পবিত্র কোরআনে কয়েকটি নির্দেশনা :

‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বল তাঁর সঙ্গে সেরূপ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না; এ আশঙ্কায় যে, তোমাদের সব আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।’ (সূরা আল-হুজুরাত : ২)।

আল্লামা শিব্বির আহমদ উসমানী (রহ.) ওই আয়াতের তাফসিরে লিখছেন : ‘অর্থাৎ মহানবী (সা.) এর মজলিসে হইচই করবে না। যেমনটি নিজেরা আপসে পরস্পর নির্দ্বিধায় রাগের বশে, ত্যক্ত-বিরক্তির স্বরে ঝটপট করে থাক। মহানবী (সা.) এর ক্ষেত্রে তেমনটি আদব-পরিপন্থি আচরণের নামান্তর। তাঁর সঙ্গে সম্বোধনের প্রয়োজনে নম্রস্বরে, সম্মান-মর্যাদাসহ, আদব-ভদ্রতার সঙ্গে কথা বলতে হবে। একটি ভদ্র ছেলে তার বাবার সঙ্গে, সুযোগ্য ছাত্র তার শিক্ষকের সঙ্গে, নিষ্ঠাপূর্ণ মুরিদ তার শায়খ-পীরের সঙ্গে এবং একজন সৈনিক তার অফিসারের সঙ্গে যেভাবে কথা বলে। একজন নবীর মর্যাদা তো এসবের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে! মহানবী (সা.) এর সঙ্গে বা তাঁর ব্যাপারে বাক্যালাপকালীন পূর্ণরূপে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ আল্লাহ না করুক যদি তাঁর সঙ্গে বা শানে বেয়াদবি হয়ে যায় এবং তাঁর অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে যায়, তাহলে একজন মুসলমানের আর কোনো আশ্রয় থাকল না। এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সব আমল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার এবং সারা জীবনের সব শ্রম-সাধনা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান।’

‘মুসনাদে বাযযার’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, ওই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর আবুবকর (রা.) নিবেদন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আল্লাহর শপথ! এখন তো আপনার সঙ্গে এভাবে কথা বলব যেভাবে কেউ কানে কানে কথা বলে থাকে।’ ‘দুররে মানছুর’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, ওই ঘটনার পর ওমর (রা.) অনেক নিচুস্বরে মহানবী (সা.) এর সঙ্গে বাক্যালাপ করতেন। বোখারিতে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আনসারদের উচ্চৈঃস্বরবিশিষ্ট খতিব সাবিত ইবন কায়েস (রা.) যখন এ আয়াতটি শুনলেন তখন তিনি গৃহে নির্জনে অবস্থান করতে লাগলেন। সায়াদ ইবনে মায়াজ (রা.) একদা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী অবস্থা? তিনি বলতে লাগলেনÑ ‘অবস্থা ভালো নয়, যে তার আওয়াজ মহানবী (সা.) এর আওয়াজের চেয়ে বড় করবে তার তো সব আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং সে জাহান্নামি হয়ে যাবে (আমিও তো তার একজন)।’

সায়াদ ইবনে মায়াজ (রা.) এ অবস্থা যখন মহানবী (সা.) এর কাছে পেশ করলেন তখন মহানবী (সা.) এরশাদ করলেন, তোমরা তাকে গিয়ে বল, ‘আপনি জাহান্নামি নন, আপনি অবশ্যই জান্নাতের অধিবাসী।’ অর্থাৎ সৃষ্টিগতভাবে কেউ একটু উচ্চৈঃস্বরবিশিষ্ট হওয়ায় বাক্যালাপকালীন আওয়াজ একটু বড় হয়ে গেলে তা ক্ষমাযোগ্য। তারপরও যথাসাধ্য আওয়াজ যেন বড় হয়ে না যায়, সচেষ্ট থাকবে। কারণ, এটাই হচ্ছে আদবের দাবি।

মহানবী (সা.) এর প্রতি এ আদব প্রদর্শন যেভাবে তাঁর বরকতপূর্ণ জীবদ্দশার ক্ষেত্রে অবশ্য জরুরি ছিল একইভাবে তা তাঁর ইন্তেকাল-পরবর্তী সময়ের ক্ষেত্রেও অবশ্যই জরুরি বলে গণ্য। আজও মসজিদে নববি (সা.) এর রওজা শরিফের দিকের দেয়ালের গায়ে ওই আয়াতটি খোদাই করে লিখিত আকারে বিদ্যমান। জিয়ারতকারীদের জন্য জরুরি, পবিত্র রওজা শরিফে উপস্থিতির সময় সালাত ও সালাম পাঠকালীন নিজ নিজ আওয়াজ নিচু রাখা চাই।

লেখক :   মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

Comments

comments

Leave a Reply