কানকথায় কান দিও না

সমাজে একটি প্রবাদ প্রসিদ্ধ আছে- ‘চিলে কান নিল’ বলে অযথা চিলের পেছনে পেছনে দৌড়ানো। অথচ হাত দিয়ে একবারও কানটা ধরে দেখেনি আসলেই কান নিয়েছে কিনা। এটাকে বলে ‘কানকথা’ বা ‘শোনাকথা’। কোনো কথা শুনেই বলে বেড়ানো হাদিসের ভাষায় এটাকেও মিথ্যা বলা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন- ‘কারও কাছে কোনো কথা শোনামাত্রই তা বলে বেড়ানো মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (মুসলিম : ৯৯৬)।

মিথ্যা বলা মহাপাপ। সব বর্ণের সব ধর্মের মানুষ মিথ্যাকে ঘৃণা করে। যারা কোনো ধর্ম মানে না, তারাও মিথ্যাকে ঘৃণা করে। যারা মিথ্যা বলে, তারাও মিথ্যাকে ঘৃণা করে। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে মিথ্যা বলাটা সহজ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মোবাইল কল বা মেসেজে। ঘরে অবস্থান করে বলে বাইরে আছি। বাইরে থাকলে বলে অফিসে বা বাসায় আছি। কর্মে ধর্মে মিথ্যার মাধ্যমে ধোঁকাবাজি প্রতিনিয়ত চলছেই। মিথ্যা এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, এটা জীবনের অবিচ্ছেদ্য স্বভাবে পরিণত হয়েছে। লোকরা মিথ্যার এত কাছাকাছি বাস করে যে, এটা পাপ বা সর্বজনস্বীকৃত ঘৃণ্য কাজ হওয়া সত্ত্বেও তার প্রতি বিরাগ বিরক্তি সৃষ্টি হয় না। মিথ্যা একাল ওকাল উভয়টাই ধ্বংস করে। অথচ মিথ্যা বলা ছেড়ে দিলে অনেক জটিল সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়। বাঁচা যায় পরকালের কঠিনতর শাস্তি থেকে। অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে মিথ্যা বলার ওপর হুঁশিয়ারি এসেছে। রাসুল (সা.) বলেন- ‘মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলে, তখন মিথ্যার দুর্গন্ধে ফেরেশতারা মিথাবাদী থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়।’ (তিরমিজি : ১৯৭২)।
শত্রুতাবশে মিথ্যার চর্চা তো অহরহ। মিথ্যার সাহায্যে কারও ক্ষতি করতে আমরা যেন মরিয়া। মিথ্যার অনেক রকম উদ্দীপক আছে। যেমন হিংসাপরায়ণ হয়ে মিথ্যা বলা; মন্দ ধারণা থেকে মিথ্যা বলা; বিদ্বেষী মনোভাব থেকে মিথ্যা বলা; বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে মিথ্যা বলা। মহানবী (সা.) এসব থেকে দূরে থেকে ভাই ভাই হওয়ার আদেশ করেন। হাদিসে মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘তোমরা কারও প্রতি খারাপ ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ খারাপ ধারণা করে কোনো কথা বলা, সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তোমরা অপরের দোষ অন্বেষণ করো না। আড়ি পেতো না। পরস্পর হিংসা করো না। একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষী ভাব প্রদর্শন করো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না। বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই-ভাই হয়ে থাকো।’ (বোখারি : ৬০৬৪)।
আমাদের সমাজের কিছু মানুষের একটা রোগ মহামারি আকার ধারণ করেছে। তারা কথায় কথায় আল্লাহর নামে শপথ করে। এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। হোক না সত্য বিষয়ে শপথ। আল্লাহর নামে মাত্রাতিরিক্ত শপথ পরিহারযোগ্য ও নিন্দনীয় কাজ। আর কেউ যদি মিথ্যা শপথ করে, তার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। আল্লাহর প্রিয় রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে লোক মিথ্যা শপথ করে কোনো মুসলমানের সামান্য পরিমাণ হকও নষ্ট করবে, সে আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে (তার মৃত্যু হবে), যখন নাকি আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট!’ (বোখারি : ২৩৫৬)।
আল্লাহর অসন্তুষ্টি অর্জন করে জান্নাতের আশা করা কতই না বোকামি। পরকালে জান্নাত যদি ভাগ্যে না জোটে, তাহলে জাহান্নাম নিশ্চিত।
কথায় কথায় শপথ করাটাকে হজরত ওমর (রা.) আল্লাহর অবমাননা মনে করতেন। তিনি তাঁর শাসনামলে একবার জনতার উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অনেক মূল্যবান উপদেশ দেন। তার একটি ছিল এই- ‘মাত্রাতিরিক্ত শপথ করবে না, যাতে আল্লাহ অপমানিত হন।’ (আত-তারিখুল ইসলামি : ২০/২৭১)।

Comments

comments

Leave a Reply