জিরো নিয়ে কারসাজী

জিরো বা শূন্য একটা সংখ্যা সেটা দিয়ে অংক করা যায়, বিজ্ঞানের কতশত সমস্যার সমাধান করা যায়। কিন্তু সেই শূন্য দিয়েই যে মানুষের চরিত্রের প্রকাশ পাওয়া যায়, সেটা এই গত কয়েক সপ্তাহে ছোট্ট দুইটা কথা দিয়েই সারা দুনিয়ার মানুষ বুঝে গেলো। একটা ছিলো ‘ুবৎড় ৎরংশ’ (জিরো রিস্ক)আর অন্যটা ‘ুবৎড় ঃড়ষবৎধহপব’ (জিরো টলারেন্স)।
থাইল্যান্ডের স্কুলের এক ফুটবল টিমের বারোজন কিশোর ও তাদের কোচ। বাচ্চাদের বয়স আর কতই বা হবে? বারো কিংবা তেরো, বড়জোর ষোলো। ফুটবল খেলা শেষে তারা হাতে একটু সময় পেয়ে, খেলার মাঠের কাছের এক গুহায় ঘুরতে গিয়েছিলো। দুর্ভাগ্যবশত হঠাৎ করে অতিবৃষ্টির ফলে ফ্ল্যাশ–ফ্লাড হয়ে সেই টানেলের ভিতরে তারা সকলেই আটকা পড়ে গেলো। শুকনার সময়, যখন তারা ঢুকেছিলো, গুহার ভিতরের টানেলগুলো সঙ্কীর্ণ হলেও, কষ্টেসৃষ্টে পার হওয়ার মত ছিলো। কোথাও একটু কুঁজো হয়ে, বা অল্প হামাগুড়ি দিয়ে ছোট্ট সেই কিশোরের দল অনেক অনেক ভিতরে চলে গিয়েছিলো। এডভেঞ্চারের উত্তেজনায়, তাদের অন্যকিছুই খেয়াল ছিলো না। আর গভীর পাহাড়ের ভিতরে সেই গুহা আর টানেলগুলোও ছিলো বেশ ঘুরানো–প্যাঁচানো, অনেকটা গোলকধাঁধার মতই। এরপরে যখন বৃষ্টি শুরু হলো, তখন আর থামবার নাম নাই। ঝরছে তো ঝরছেই। পানি জমতে জমতে টানেলগুলো ডুবে যেতে লাগলো। প্রথমে ছপছপে পানি, এরপরে হাঁটু সমান, তারপরে বুক ছাড়িয়ে কোন কোন জায়গায় টানেলের ছাদ অবধি পানি। বের হওয়ার কোন উপায়ই নেই। কোনমতে তারা সকলে একটু উঁচুমত জায়গায় আশ্রয় নিলো।
বেরী পরিবেশেও, কিছু কিছু জিনিস ছিলো তাদের পক্ষে ছিলো। প্রথমত তারা দলছুট হয়ে যায় নাই। বারোজনই একসঙ্গে ছিলো। ফুটবল খেলতে খেলতে, তাদের নিজেদের মধ্যে একটা টীমওয়ার্ক গড়ে উঠেছিলো। সকলে খুব সহজেই একসঙ্গে কাজ করতে পারে, নিজেদের মধ্যে কমিউনিকেশান সহজ, তারা একে অন্যের জন্য সহমর্মী। একটা টিম যে কত বড় সহায়ক, সেটা এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়লেই মাত্র বুঝা যায়। আর সেই সঙ্গে ছিলো তাদের টিম–কোচ। সকলেই তাঁর কথা মেনে চলে। বছর চার–পাঁচেক আগে, দক্ষিণ অ্যামেরিকার চিলিতে এক খনিতে ভূমিধ্বস হয়ে বেশ কিছু শ্রমিক খনির অনেক গভীরে আটকে গিয়েছিল; তখন তারা একে অন্যকে মনোবল জুগিয়েছিলো কাউকে ভেঙ্গে পড়তে দেয় নাই। সারা বিশ্বের টিভি ক্যামেরার সামনে সফলভাবে তাদের উদ্ধার কাজ হয়েছিলো। সেই খনি শ্রমিকদের ঘটনার কথা মনে করে করেও কিশোরদের এই টিম নিজেদের মনোবল চাঙ্গা রাখেছে। পাক্কা দশ–দশটা দিন পরে তাদের সন্ধান পাওয়া গেলো। তারা নিজেদের সঙ্গের অতি অল্প কিছু খাওয়ার বা স্ন্যাক্স্ এবং গুহার ছাদ ও দেয়াল চুইয়ে পড়া পানি খেয়ে দিন কাটিয়েছিলো।
থাই সরকার ও চিয়াং–রাই প্রাদেশিক সরকার কোন ধরনের কালক্ষেপণ না করেই, সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ–অ্যামেরিকান–অস্ট্রেলিয়ান এবং বিশ্বের অন্য সব দেশের সাহায্য প্রার্থনা করলো। শিশু–কিশোরদের জীবন বলে কথা। তাদেরকে যে কোনো মুল্যেই হোক বাঁচাতে হবে, উদ্ধার করতে হবে। এইটাই ছিলো থাই সরকারের পরিকল্পনা। এজন্য কারো কাছেই হাত পাততে কুন্ঠা বোধ করে নাই। আর, বিশ্বের সকল দেশও এগিয়ে এসেছিলো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। তাদের দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ অভিজ্ঞ ঝানু ডাইভার, নেভি–মেরিন, সীল–টিম পাঠিয়ে দিয়েছিলো। ব্রিটিশ নেভীর একজন প্রথম তাদের খুঁজে পায়। কী যে আনন্দ! সে প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলে, তাদের ভিডিও করে। তাঁর কাছে যতটুকু ছিলো সেই খাওয়ারটুকুও তাদের দিয়ে দেয়।
তাদেরকে খুঁজে পাওয়া গেলেও, কিন্তু ব্যাপারটা দাঁড়ালো তাদেরকে উদ্ধার করে বের করে আনা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনেক অভিজ্ঞ নেভির ডাইভাররা গভীর পানির ভিতরে ডুব দিয়ে দিয়ে, সরু সরু গুহাপথের ভিতরের ধাঁধা লাগানো টানেলের ভিতর দিয়ে দিয়ে গিয়ে তাদের খুঁজে পেলেও, একইভাবে তাদের আনা সম্ভব নয়। সরকার ঘোষণা দিলেন, কিশোরদের পাওয়া গেছে, খুশীর সংবাদ; কিন্তু আমরা হুট করে কিছুই করে বসবো না। তারা আমাদের অমূল্য সম্পদ। আমরা জিরো রিস্ক নিয়ে তাদের বের করে আনবো। এত কষ্টে যাদের পাওয়া গেলো, তাদেরকে গুহা থেকে বের করে আনতে গেলে যদি কারো কিছু ক্ষতি হয়, বা প্রাণহানি হয়, আমরা সেটা মেনে নিতে পারবো না।
এরপরে, সারা দুনিয়ার সকলে টিভিতে দেখলো, কীভাবে ধৈয্য ধরে, সকলে মিলে অনেক অনেক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান করে, ঝানু ঝানু ডাইভারদের কাজে লাগিয়ে, একে একে বারোজন কিশোর ও তাদের কোচকে বের করে নিয়ে আসা হলো।
সন্ধান পাওয়ারও আঠারো দিন পরে তাদের বের করে আনা হলো। এর মাঝে তাদেরকে নিয়মিত খাওয়ার দেওয়া হয়েছিলো, কম্বল দেওয়া হয়েছিলো, গুহায় পাইপ দিয়ে বাতাস ও অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়েছিলো। অনেকগুলো পাম্প চালিয়ে টানেলের মেঝের পানি বের করে ফেলে দেওয়া হয়েছিলো। দুঃখজনক হলেও, একজন অভিজ্ঞ ডাইভার বাচ্চাদের অক্সিজেন ট্যাঙ্ক সাপ্লাই দিয়ে ফেরত আসতে গিয়ে, নিজেই ডুবন্ত অবস্থায় অক্সিজেনের অভাবে মারা গেলো। বাচ্চাদের উপকার করতে গিয়ে সে বীরের মত মরলো।
এবারে মুদ্রার উল্টা পিঠ দেখি। আর অন্য জিরো নিয়ে কথা বলি। কয়েক সপ্তাহ্ আগে, অ্যামেরিকার এটর্নি জেনারেল, জেফ সেশান, তার অতি প্রিয় বসের মনস্কামনা পূরণের জন্য একটা ঘোষণা দিলো। এখানে মনে রাখবেন যে জেফ সেশানের এই বস্, মানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প,বেশ অনেকবারই জেফ সেশানকে যা তা বলে ধিক্কার দিয়েছিলো, সকলের সামনে বক্তৃতায় তাকে কটুবাক্য বলে বলে হেয় করেছিলো। সেই জেফ সেশানই পা–চাটা কুকুরের মত ‘জিরো টলারেন্স’ পলিসি জারী করলো। এই পলিসি মতো অ্যামেরিকায় কেউ যদি অবৈধভাবে প্রবেশ করে, তাহলে তাদের কোন কথাই শুনা হবে না; তাদের প্রতি কোন রকমের করুণা না দেখিয়ে তাদেরকে আইন অমান্যকারী বিবেচনা করে জেলে পুরা হবে। এবং ইমিগ্রেশান কোর্টে দ্রুত বিচার করে তাদেরকে ডিপোর্ট করে দেওয়া হবে। কোনো ধরনের কোন সুযোগই তাদের দেওয়া হবে না। এটাকেই জিরো টলারেন্স পলিসি হিসাবে উল্লেখ করা হলো।
আমরা সকলেই জানি যে, অ্যামেরিকা হলো ইমিগ্র্যান্টদের দেশ। যুগ যুগ ধরে অন্য দেশ থেকে ইমিগ্র্যান্টরা অ্যামেরিকায় এসে এই দেশ গড়ে তুলেছে। আর, গোড়ার কথা বলতে গেলে তো বলতে হয় যে, প্রথম আমলের ইউরোপীয়ানরা (যার মাঝে ট্রাম্প, জেফ সেশান, স্টীভ মিলার, স্টিভ বেনন এদের সকলের পূর্বপুরুষেরাই আছে) এখানের আদি অধিবাসীদের কচুকাটা করে, নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে তাদের থেকে জোর–জবরদস্তি করে জমি দখল করে নেয়। তাদের তাড়িয়ে দেয়, মেরে ফেলে। যা হোক, সেই কালো ইতিহাস তো না হয় গেলো। বর্তমান যুগেও তো এদেশ ইমিগ্র্যান্টদের উপরে অনেক অনেক নির্ভরশীল। এবং ট্রাম্প ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত এদেশ অনেক সভ্যভাবে ইমিগ্রেশানের ব্যাপারটা মেনে চলতো। সকলকেই সুযোগ দেওয়া হতো। বৈধভাবে লাখে লাখে অভিবাসী এদেশে আসছে। আর যারা অবৈধভাবে আসছে, তাদেরকেও হুট করে বের করে দেওয়া হতো না। তাদেরকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রচুর সুযোগ দেওয়া হতো। শুধু সুযোগ বললে ভুল হবে, সুযোগের সঙ্গে সুবিধাও দেওয়া হতো। তাদেরকে উকিল দেওয়া হতো, থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতো। অনেক দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার হলে, সাময়িকভাবে কাজ করার পারমিশানও দেওয়া হতো। আরো কত কিছু।
কিন্তু ঐ যে, জিরো নিয়ে কারসাজী করে বসলো জেফ সেশান ও তার প্রভু। এমনকি নিজদেশে বিপদে পড়ে যারা অ্যাসাইলাম চাইতে এসেছে, তাদেরকেও রেহাই দেওয়া হবে না। মানুষ মূলত কী কারণে অন্যদেশে ইমিগ্রেশান নেয়? জীবনের সুযোগসুবিধা বাড়ানোর জন্য, উচ্চতর পড়ালেখা ও গবেষণার সুবিধার জন্য, কেউ অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য। আর একদল হচ্ছে আশ্রয় প্রার্থনাকারী। কেউ যুদ্ধের মাঝ থেকে জান নিয়ে পালিয়ে আসে, কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় চায় (সরকারের বিপক্ষদলের), কেউ সামাজিক আশ্রয়প্রার্থী (ভায়োল্যান্স থেকে আত্মরক্ষার্থে, স্বামী বা পরিবারের হাতে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার্থে, বা ড্রাগ ও গ্যাং ভায়োল্যান্স থেকে আত্মরক্ষার্থে)। আরো কতরকমের অ্যাসাইলাম প্রার্থী আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সময়ে নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে আসা ইহুদী ও অন্যান্যদের জন্য লীগ অফ নেশান্স, এবং পরবর্তীতে জাতিসঙ্ঘ অ্যাসাইলাম প্রার্থনাকারীদের মৌলিক অধিকারের ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বলে দিয়েছে। কিন্তু জেফ সেশানের কথা হলো, ভিসা ছাড়া, কেউ যদি অ্যামেরিকার বর্ডার পার হয়ে এসে এদেশের মাটিতে পা দেয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই সে একটা ক্রাইম করে ফেললো। ভিসা ছাড়া এদেশে ঢুকাটাই তাঁর প্রধান ক্রাইম। এবং এর ফলে তাকে জেলে পাঠিয়ে, দ্রুত বিচার করে, ডিপোর্ট করে দেওয়া হবে। কিন্তু এইটা যে কতবড় নিষ্ঠুর পলিসি, সেটা একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন। মেক্সিকো বা দক্ষিণ অ্যামেরিকা থেকে যতজন আশ্রয় প্রার্থনাকারী আসে, তারা সবসময়েই পরিবারের কয়েকজন একসঙ্গে আসে। গ্যাং বা ড্রাগ ভায়োল্যান্স এড়াতে, বাবা–মা তাদের সব সন্তান–সন্ততিকে সাথে করেই নিয়ে আসে।
এখন ট্রাম্প–সেশানের এই নির্দয় পলিসির কারণে, অ্যামেরিকায় ঢুকার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের ডিটেইন করা হচ্ছে; কিন্তু শিশুদের কী হবে? তড়িঘড়ি করে, বাবা–মা বা অভিভাবকদের কাছ থেকে আলাদা করে নিয়ে এই শিশুদেরকেও এক একটা জায়গায় রাখা হচ্ছে। কিন্তু সেইটা যে কত করুণ, কত নির্মম তা অল্প একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে। প্রথমত পলিসি ঘোষণা দিলেই হয় না, সেইটা সুষ্ঠুভাবে কি করে বাস্তবায়ন করা হবে, তারও দিকনির্দেশনা দিতে হয়। তা নাহলে অনিয়ম হয়, বা মাঠ পর্যায়ে, কর্মক্ষেত্রে এক একজন এক একভাবে সেই পলিসি বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে। আসলেই তাই–ই হলো। শিশুদের কোন রকমের সনাক্তকরণের ব্যবস্থা না করেই, তাদেরকে অ্যামেরিকার মধ্যে বিভিন্ন শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হতে থাকলো। কার বাচ্চা কোথায় যাচ্ছে, কারো কোন ঠিকঠাক নাই। ছোট ছোট শিশুদেরকে জোর করে তাদের পরিবার থেকে আলাদা করাটাই তো একটা অমানবিক কাজ, তারপরে যদি এরকম মিস্–ম্যানেজমেন্ট করা হয়, তাহলে তাদের ভোগান্তির শেষ থাকে না।
আস্তে আস্তে এই সমস্ত খবর বের হয়ে আসতে থাকলো, আর সকলেই ট্রাম্প–এডমিনিস্ট্রেশানের উপরে ক্ষিপ্ত হতে থাকলো। বিশেষ করে কয়েকটা খবর সকলকে খুবই নাড়া দিলো শিশুদেরকে খাঁচার মাঝে রাখা, এক–দুই–তিন বছরের শিশুদেরকেও বাবা–মা থেকে আলাদা করে ফেলা। ভাই–ভাই বা ভাই–বোনদেরকেও আলাদা করা, ইত্যাদি। অবশেষে ট্রাম্প বাধ্য হয়ে একটা ঘোষণা দিলো যে, এখন থেকে আর বাচ্চাদের আলাদা করা হবে না। কিন্তু যেই তিন হাজার বাচ্চা অলরেডি আলাদা হয়ে গেছে তাদেরকে পুনরায় তাদের বাবা–মা’র সঙ্গে এক করা যে কী দুরুহ হয়ে দাঁড়ালো, সেটা না বললে বিশ্বাস করা যায় না। অ্যামেরিকার মত এত উন্নত দেশ এই রকম কাজ যখন করলো, তখন সেটাকে আনাড়ির কাজ বলা যায় না; আমার তো মনে হয় এই রকম অমানবিক কাজ তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই করেছে। তাদের হয়তো উদ্দেশ্য ছিলো, ভবিষ্যৎ অবৈধ–অনুপ্রবেশকারীদের নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু,সেটা করতে গিয়ে যে এই সমস্ত নিরীহ–নিষ্পাপ শিশুদের কী পরিমাণ কষ্ট–যন্ত্রণা দিলো, পরিবারের সকলকে কী পরিমাণ মানসিক অত্যাচার করলো, তাঁর কোনোই তুলনা হয় না। আমার তো মনে হয়, সেই পরিবারগুলোর বদ্–দোওয়াতেই ট্রাম্প–সেশানের কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। ট্রাম্পের নিজেরই তো একটা বারো বছরের ছেলে আছে। তাকে যদি এইরকম ভাবে আলাদা করে ডিটেনশানে রাখা হতো, তাহলে তার বা মিলানিয়া ট্রাম্পের কেমন লাগতো? ট্রাম্প–সেশান এই ব্যাপারটা করে এতই হীনন্মন্যতার পরিচয় দিলো যে মিলানিয়া ট্রাম্প ও অন্যান্য আর সব প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের স্ত্রীরা এর বিপক্ষে কথা বলা শুরু করলো। এর থেকেই বুঝা যায় যে, কাজটা কত অমানবিক, কত নিষ্ঠুর মনের পরিচায়ক।
অদ্ভুত শুনালেও, এই জিরো টলারেন্স পলিসির স্বপক্ষেও হাজার হাজার মানুষ আছে, তারা ট্রাম্প–সেশানকে সাধুবাদ দিচ্ছে। আবার এর বিরুদ্ধে লাখে লাখে মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠছে, শহরে শহরে প্রতিবাদ মিছিল, ডেমোনেস্ট্রেশান করছে। আমি জানি, অনেক বর্ডার–পেট্রোল এজেন্সীর লোক নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ করে স্বেচ্ছায় কাজে ইস্তফা দিয়েছে। অ্যামেরিকান সিভিল লিবার্টি ইউনিয়ন (অঈখট) সরকারের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলাও করেছে, এবং অনেকগুলোতে জিতেও গেছে। তাদের মামলার পরিণতিতেই ক্যালিফোর্নিয়ার এক জজ, ট্রাম্প সরকারকে সময় বেঁধে দিয়েছে যে, অমুক তারিখের মাঝে পরিবারগুলো সব সদস্যদের এক করে দিতে হবে। যেহেতু কোনো ট্রেসিবিলিটি ছিলো না, তাই জজের এই নির্দেশ মানতে সরকার হিমসিম খাচ্ছে। পরিবারের ভোগান্তি, অনিশ্চয়তা বাড়ছে তো বাড়ছেই। এখন বলছে উঘঅ টেস্ট করে করে পরিবার মিলাবে মানে আর এক ফ্যাঁকড়া। দুই–তিন বছরের বাচ্চাকে একা একা ইমিগ্রেশান কোর্টে হাজির করিয়েছে। অবুঝ শিশু কী বুঝবে জজের কথা, কোর্টের আদেশ বা নিয়ম–কানুন?
সারা দুনিয়া দেখতে পেলো দুই জিরোর কারসাজী। ওয়ার্ল্ড কাপ চলছে এবং এই সময়ে একজন একটা খুবই সময়োপযোগী মন্তব্য করেছে। ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড–ফ্রান্স–জার্মানী–জাপান–ক্রোয়েশিয়া প্রভৃতি সব দেশের সব দলগুলোর চাইতেও সারা বিশ্বের সবচাইতে বেশী ফেভারিট ফুটবল টীম হলো, থাইল্যান্ডের সেই কিশোরদের টীম। তারা সকলের মমতা কেড়ে নিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প–সেশান কুড়িয়েছে ধিক্কার। থাই সরকার ট্রাম্পের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা করে বিশ্বের সব দেশ মিলে কাজ করলে, কী ভাবে কাজটা সুসম্পন্ন হয়। অন্যদিকে, বেহায়া ট্রাম্প আন্তর্জাতিক সব চুক্তিগুলোকে ছিঁড়ে–ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে প্যারিস পরিবেশ–চুক্তি, টিপিপি, ইরান–নিউক্লিয়ার চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে। জি–সেভেন ও ন্যাটোর সদস্যদের হেয় করে কথা বলছে। মাঝে মাঝে চিন্তা করি একটা মানুষ কত নীচ হতে পারে? সে–তো মনুষ্যত্বের জিরো–লেভেল থেকেও নিচে নেমে নেগেটিভে চলে গিয়েছে।

Leave a Reply