ওস্তাদ, ডাইনে-বামে প্লাস্টিক!’

মনদীপ ঘরাই: কথাটা প্রথম কবে শুনেছি এখন মনেও করতে কষ্ট হয়। তবে খুব মনে আছে শুনেছি কোনো লোকাল বাসে বসেই। শুরুতে শুরুতে ভাবতাম, ‘প্লাস্টিক” কোথায়?’ পরে বুঝলাম প্লাস্টিক মানে প্রাইভেট কার।

পাঠক মন নিশ্চয়ই ভাববেন আজকের লেখাটা প্রাইভেট কার বা যানবাহন নিয়ে। একদম না। বরং উপরের ডায়ালগটাকেই টেনে একটু লম্বা বানাই। ‘আমাদের ডাইনে-বামে-উপর-নিচে সবদিকে প্লাস্টিক।’

এইতো ধরতে পেরেছেন। আলোচনাটা প্লাস্টিক নিয়ে।

আমাদের সকাল থেকে রাত এখন প্লাস্টিকের গারদে বন্দী। পছন্দ হচ্ছে না তো? চলুন তাকাই নিজেদের জীবনের দিকে।

সকালে উঠেই টুথব্রাশ কিংবা রেজর- প্লাস্টিক। অফিস কিংবা স্কুলে নেয়ার টিফিন বক্স-প্লাস্টিক। এটিএম কার্ড, পানির বোতল, খাবারের প্লেট, গাড়ীর যন্ত্রাংশ, ল্যাপটপ…সবই প্লাস্টিক। আর যদি হন চেয়ারম্যান, তাহলে চেয়ারম্যানের চেয়ারও নাকি ইদানিং প্লাস্টিকের হয়; বিজ্ঞাপন তো তাই বলে।

ফুল এখন আর ড্রইং রুমে সুবাস ছড়ায় না। কারণ, ওগুলোও প্লাস্টিক। আরও মজার কথা শুনবেন? আমরা এখন সত্যিকারের ফুলও প্লাস্টিকে মুড়িয়ে তোড়া বানাই!

আগে ঝালমুড়িটা অন্ততঃ কাগজের ঠোঙ্গায় খেতাম। এখন সেটাও প্লাস্টিকের প্যাকেটজাত হয়ে গেছে।

বৃষ্টি ঠেকাতে কিংবা জন্মনিয়ন্ত্রণ: রেইনকোট মানেই প্লাস্টিক।

উদ্ভাবনের এই কি শেষ? বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায় ডিম, চাল এগুলোতেও ঢুকেছে প্লাস্টিক। খেলনা কিংবা ফেলনা কোথায় নেই প্লাস্টিক?

প্লাস্টিক পরিবারে একজন বড় ভাই আছে। ওনার নাম পলিথিন। শহরে-গ্রামে ওনাকে চেনেন না এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার।

৫ টাকার মরিচ কিনুন আর ৫ কেজি চাল, ঢুকবে শেষমেষ পলিথিনে। পকেটের মোবাইলটাকেও বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে ভরসা পলিথিন। ওহ্ হো। ভুলেই তো গেছিলাম। মোবাইলও তো প্লাস্টিক! যে কলমটা দিয়ে লিখছি সেটাও তো…

এবার কোটি টাকার প্রশ্ন। হঠাৎ প্লাস্টিক আর তার ভাই পলিথিনের পেছনে লাগলাম কেন? জবাবটা দিচ্ছি। একটু দম নিতে তো দেবেন। সাথে প্লাস্টিকের গ্লাসে একটু পানি খেয়ে নেই!

ধরুণ, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। হাতে চিপসের খালি প্যাকেট। কি করবেন? জবাব সোজা। ফেলে দেবো! আমরা তো ঠিক তা ই করছি। আপনার মতো আরো হাজার জন মানুষ এই মুহূর্তেই হাত থেকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলছে পলিথিন কিংবা প্লাস্টিকের নানান জিনিস।

এগুলো যাচ্ছে কোথায়?তা দিয়ে আপনার-আমার কী? আপনার ফেলার কাজ ফেলুন তো!

কিন্তু, এই করে করে আমরা কত বড় ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছি জানেন?

আপনি না ঢাকায় থাকেন? তাহলে তো বর্ষার আগে এসব চিন্তার কারণ নেই, তাই না?

ড্রেনগুলো যে পলিথিন আর প্লাস্টিকে গাদিয়ে ফেলেছেন, বর্ষা তো শোধ তুলবেই। জিগাতলা অথবা মতিঝিল সি বিচে গা ভেজাতে আগে ভাগেই ছুটিটা নিয়ে রাখবেন কিন্তু!

এতো গেলো তুচ্ছ বিষয়। এবার মনে ভয় ধরাই! প্লাস্টিক মাটিতেও মেশে না। পানিতেও গলে না। এই অবিনাশী গান কি আমরা শুনতে চেয়েছিলাম? হয়তো চাই নি।

তবে, সব প্লাস্টিক নিজ দায়িত্বে খাল-নদী পেরিয়ে মিশছে সমুদ্রে। আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় ধারণা করা হচ্ছে, এমনিভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালে সমুদ্র তলদেশে মাছের চেয়ে বেশি প্লাস্টিকের জিনিসপত্র থাকবে।

ইতিহাস আর উৎসে ঘুরে আসি চলুন। প্লাস্টিক শব্দটা এসেছে গ্রীক শব্দ Plastikos থেকে, যার অর্থ হলো যাকে মনের মতো গড়া যায়। সত্যিই তো তাই। তা না হলে মাটির জায়গাটা নিতে পারতো প্লাস্টিক? পাগল ভাবছেন? মাটির ব্যাংক যে এখন প্লাস্টিকের তৈরি হয়, সে খেয়াল আছে তো!

শব্দের উৎসটা গ্রীস হলেও বিশ্বের প্রথম প্লাস্টিকের আবিস্কার যুক্তরাস্ট্রের নিউইয়র্কে। উদ্ভাবক  লিও বেকল্যান্ডের নামে প্রথম প্লাস্টিকের ডাকনাম ছিল ‘বেকলাইট’।

এবার চোখ ফেরাবো সংবাদমাধ্যমে ওই প্লাস্টিক আবিস্কারের দেশের বর্তমানের খবর দিয়ে। এতদিন বিশ্বের মোট বর্জ্য পলিথিনের ৪৫ শতাংশ আমদানি করে রিসাইকেল করতো চীন। যে তালিকায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রও।

সম্প্রতি চীন এ আমদানি বন্ধ করায় বর্জ্য প্লাস্টিক নিয়ে বিপদেই পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিদিন নাকি স্তুপ হয়ে জমছে শুধু ৪০ হাজার প্লাস্টিকের বোতলই!

এমন দুশ্চিন্তা কি আমাদেরও কপালে ভাঁজ ফেলছে না?

এবার আরেকটা খবর। বিবিসির প্লাস্টিক ওয়াচ নামের এক ডকুমেন্টারিতে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। অস্ট্রেলিয়ার লর্ড হাউই নামের ছোট্ট দ্বীপে ঘটছে ভয়াবহ ঘটনা। তীরবর্তী পাখিরা মরছে নিয়মিতভাবেই। এমন একটি মৃত পাখির পেটে দেখা যায় প্লাস্টিকের টুকরায় ভর্তি। শুধু তাই নয়, ৮০ দিন বয়সী জীবিত পাখির পেট থেকে বের হয়েছে ৫১ পিস প্লাস্টিক!

এই দ্বীপ থেকে সাগরে ভাসতে ভাসতে যাবো আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মুম্বাই সি বিচে, মানে মুম্বাইতে। সেখানে আশা জাগাচ্ছে একটি খবর। ২৩ জুন থেকে মহারাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার। আইডিয়াটাও দারুন: ‘চলুন ফিরে যাই সেই দিনে, যখন প্লাষ্টিক ছিল না।’

এবার নিজের দেশের আশার খবর দিয়ে শেষ করবো। প্লাস্টিকের অবিনাশী আতঙ্কে ইতি টানতে যাচ্ছে বাংলাদেশের উদ্ভাবন।

সোনালী আঁশ পাটের তন্তু দিয়ে তৈরি হচ্ছে পলিথিন ব্যাগ; যা মাটিতে মিশে যাবে, আগুনে পুড়বে এবং পানিতে গলবে। অর্থাৎ পরিবেশের সাথে বন্ধুত্ব করার মতো এক পলিথিন আবিস্কার করেছেন ড. মোবারক হোসেনের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীদের একটি দল। আজ থেকে মাস কয়েক পর হয়তো ব্যবহারিক সুফল মিলবে এ আবিস্কারের।

তার আগে ভাবনা আছে বড়। এতদিনে উৎপাদিত প্লাস্টিকের ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিন্তার সময় এখনই। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ক্ষতিকর পলিথিনের নতুন উৎপাদন বন্ধ করতে পারলেই কেবল মিলতে পারে স্বস্তি।

আর তা না হলে?

‘একদিন হয়তো মনটাই পলিথিনে মোড়া প্লাস্টিকের হয়ে যাবে! রোদে পুড়বে না। বৃষ্টিতে ভিজবে না। থাকবে না কোনো আবেগ কিংবা অনুভূতির মানবিক জ্বালাতন!’

লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

Comments

comments

Leave a Reply